রাত ১:৩৯ | মঙ্গলবার | ২০শে মে, ২০১৯ ইং | ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

তিন জিয়ার নৃশংসতা (জিয়া+খালেদা+তারেক)…..মিঞা মুজিবুর রহমান

“বঙ্গবন্ধু হত্যায় জিয়া”
১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট শুক্রবার ভোরে একদল সেনাসদস্য নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। এই নির্মম হত্যাকাণ্ড ছিল একটি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। জিয়াউর রহমানসহ স্বাধীনতাবিরোধী চক্র মুজিবকে হত্যা করে একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণ করে। স্বাধীনতাবিরোধী যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও তাদের এদেশীয় দোসররাই যে বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্র করেছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আমেরিকারনিক্সন-কিসিঞ্জার এবং পাকিস্তানের ভুট্টো চক্র বাংলাদেশের স্বাধীনতারই শুধু বিরোধিতা করেনি, স্বধীন বাংলাদেশ যাতে বিশ্ব মানচিত্রে টিকে থাকতে না পারে তারও চক্রান্ত করেছিল।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার এবং পাকিস্তানের ভুট্টো যে বঙ্গবন্ধু হত্যা ষড়যন্ত্রে জড়িত, এর প্রমাণও রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রবল প্রতাপশালী দেশের বিরোধিতা সত্তেও মাত্র ৯ মাসের যুদ্ধে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যায়। কিসিঞ্জারের সাবেক স্টাফ অ্যাসিস্ট্যান্ট রজার মরিস এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের নেতা শেখ মুজিবের প্রতি তার (কিসিঞ্জার) ঘৃণার কথা স্বীকার করেছেন।

মরিস জানান, ‘শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে কিসিঞ্জার তার ব্যক্তিগত পরাজয় বলে মনে করতেন। কিসিঞ্জারের বিদেশি শত্রুর তালিকার সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তিরা হচ্ছেন আলন্দে, থিউ ও মুজিব। এ তিনজন তার বিভিন্ন পরিকল্পনা ভণ্ডুল করে দেন। মুজিব ক্ষমতায় আসেন সবকিছু অগ্রাহ্য করে। আমেরিকা ও তার অনুগ্রহভাজন পাকিস্তানকে সত্যিকারভাবে পরাজিত করে এবং মুজিবের বিজয় ছিল আমেরিকার শাসকবর্গের পক্ষে অত্যন্ত বিব্রতকর।

বিদেশিদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যায় সবচেয়ে বেশি উল্লসিত হন পাকিস্তানের ভুট্টো। অবশ্য ভুট্টোর পরিণতি ছিল আরও মর্মান্তিক। জে. জিয়াউল হক ভুট্টোকে ১৯৭৯ সালে ফাঁসি দেয়ার আগেই ফাঁসির সেলে সীমাহীন নির্যাতন করে। বেনজীর ভুট্টো এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ফাঁসি পূর্বে তিনি তার পিতাকে দেখতে গিয়েছিলেন। নির্যাতনের ফলে ভুট্টো এমন নির্জীব হয়ে পড়ে যে তার এক গ্লাস পানি উঠিয়ে খাওয়ার ক্ষমতা ছিল না। ১৫ আগস্ট মুজিব হত্যার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই পাকিস্তান বাংলাদেশের খুনি সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। বঙ্গবন্ধু হত্যায় খুশিতে ডগমগ ভুট্টো তাৎক্ষণিকভাবে মীরজাফর মোশতাক সরকারকে ২ কোটি ডলার মূল্যের ৫০ হাজার টন চাল ও দেড় কোটি গজ কাপড় দেয়ার কথা ঘোষণা করে। কিন্তু কিসিঞ্জার-ভুট্টোরা বাংলাদেশের খুনিদের দিয়েই হত্যাকাণ্ডটি ঘটায়। বিদেশি প্রভুদের মদতে খন্দকার মোশতাক ও সেনাবাহিনীর তৎকালীন উপ-প্রধান জে. জিয়াউর রহমানের লেলিয়ে দেয়া ফারুক-রশিদ-ডালিম-নূর চক্র বঙ্গবন্ধু পরিবার এবং তার স্বজনদের নির্মমভাবে হত্যা করে।

তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যাচ্ছে এতে দেখা যায়, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানসহ সেনাবাহিনীর তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনেকের ভূমিকাই স্বচ্ছ ছিল না। জিয়া ওই হত্যা ষড়যন্ত্রে প্রত্যক্ষভাবেই নেতৃত্ব দিয়েছেন। যেজন্য মুজিব হত্যার সবচেয়ে বড় বেনিফিশিয়ারি (লাভবান) মানুষ হচ্ছেন জিয়া।
মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের ২ বছর সিনিয়রিটি দেয়া পাকিস্তান প্রত্যাগতরা কোনভাবেই মেনে নিতে পারেননি। তাছাড়া তাদের জুনিয়র সফিউল­াহ, জিয়া, খালেদদের অধীনে চাকরি করাও তারা অপমান বোধ করতেন।

জেনারেল জিয়া যে বঙ্গবন্ধু হত্যা ষড়যন্ত্রের এদেশীয় মূল হোতা, তারও শত শত প্রমাণ রয়েছে। ১৫ আগস্ট ভোর রাতে শাফায়াত জামিলের কাছে বঙ্গবন্ধু হত্যার খবর পেয়ে জিয়া ইংরেজিতে বলেন, ‘তাতে কি হয়েছে? প্রেসিডেন্ট নেই, ভাইস প্রেসিডেন্ট তো রয়েছেন।’ এই একটি উক্তিই প্রমাণ করে হত্যা-ষড়যন্ত্রে তার যোগসাজশ। ঘাতক ফারুক রশীদ ১৯৭৬ সালেই সানডে টাইমস ও বিদেশি টেলিভিশনে প্রদত্ত সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জে. জিয়ার মদত দেয়ার কথা বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার ৯ দিনের মাথায় সেনাপ্রধান সফিউল­াহকে বরখাস্ত করে খুনি চক্র জিয়াকে সেনাপ্রধান হিসেবে পদোন্নতি দেয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার সবচেয়ে লাভবান ব্যক্তি হচ্ছেন জে. জিয়া। রাষ্ট্রপতি ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা না করলে জিয়া কোনদিনই সেনাপ্রধান, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও রাষ্ট্রপতি হতে পারতেন না।
আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীদের সুপরিকল্পিত পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই বঙ্গবন্ধু হত্যার তিন মাসের মাথায় জিয়াকে রাষ্ট্রক্ষমতায় আনা হয়। জে. জিয়ার জীবিতকালে ফারুক রশীদরা বঙ্গবন্ধু হত্যায় জিয়ার জড়িত থাকার কথা বললেও তিনি কোনদিন এর প্রতিবাদ করেননি। অন্যদিকে জে. জিয়া বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার শুধু বন্ধ রাখেননি, আত্মস্বীকৃত খুনিদের রাষ্ট্রীয় উচ্চপদে চাকরি দিয়ে প্রমাণ করেছেন, তিনি খুনিদের ঘনিষ্ঠ দোসর ছিলেন। সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান হিসেবে জে. জিয়া খুনিচক্রকে সহযোগিতা ও মদত না দিলে ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে কোনভাবেই হত্যা করা সম্ভব হতো না।

ঢাকাস্থ ৪৬ ব্রিগেডের কমান্ডার কর্নেল শাফায়াত জামিল এবং ১৫ আগস্ট বিদেশে অবস্থানরত রক্ষীবাহিনী প্রধান ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামান কোনভাবেই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড মেনে নিতে পারেননি। ‘৭৫-এর ৩রা নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বাধীন ক্যু-এর দুই শক্তিশালী স্তম্ভ ছিলেন নুরুজ্জামান ও শাফায়াত।

এটা এখন স্পষ্ট, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ব্যর্থতার কারণেই মুষ্টিমেয় কয়েকজন খুনি জাতির পিতাকে হত্যা করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হয়েছিল। যদ্দুর জানা যায়, হত্যার পর ফারুক-রশীদ চক্র অসহায় অবস্থায় সিনিয়র সেনা কর্মকর্তাদের বলতে থাকে ‘আমরা একটি ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছি। আপনারা পরিস্থিতি সামলান।’ যদি ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা সেদিন চেইন অফ কমান্ড রক্ষার মাধ্যমে সংবিধান সমুন্নত রাখতেন, তাহলে মোশতাক, সায়েম, জিয়া, এরশাদ চক্র ১৫ বছর অবৈধভাবে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে পারতো না। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচারক ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল রায়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সময় তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল সফিউল্লাহ, কর্নেল শাফায়াতসহ উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের তীব্র সমালোচনা করেছেন। রায়ে বলা হয়, ‘এই ঘটনা আমাদের জাতীয় ইতিহাসে সেনাবাহিনীর জন্য একটি চিরস্থায়ী কলঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।’

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, স্বাধীনতাবিরোধী আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীদের এদেশীয় খাদেম জে. জিয়ার ক্ষমতা লিপ্সার কারণেই সেনাবাহিনী শুধু নয়, বাংলার ইতিহাসও কলঙ্কিত হয়েছে।
সপরিবারে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল সেনাবাহিনীর কিছু কর্মকর্তা। সে সময় ঢাকা সেনানিবাসে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে কর্মরত ছিলেন আমিন আহমেদ চৌধুরী, যিনি পরে মেজর জেনারেল হয়েছিলেন। আমিন আহমেদ চৌধুরীর মৃত্যু হয় ২০১৩ সালে।

২০১০ সালে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আমিন আহমেদ চৌধুরী জানিয়েছিলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোর পাঁচটার দিকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সেনা কর্মকর্তা মেজর রশিদের নেতৃত্বে একদল সেনা তার বাড়ি ঘিরে ফেলে।

আমিন আহমেদ চৌধুরী তখনো জানতেন না যে, রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। মেজর রশিদের নেতৃত্বে সেনারা আমিন আহমেদ চৌধুরী এবং তৎকালীন কর্নেল শাফায়াত জামিলকে নিয়ে যায় মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের বাড়িতে। জেনারেল জিয়া তখন সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান।

জেনালের জিয়াউর রহমানের বাড়িতে ঢোকার সময় রেডিওর মাধ্যমে আমিন আহমেদ চৌধুরী জানতে পারেন যে, রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছে।

সেই ঘটনা প্রসঙ্গে আমিন আহমেদ চৌধুরী বিবিসিকে বলেছিলেন, ‘জেনারেল জিয়া একদিকে শেভ করছেন, একদিকে শেভ করে নাই। স্লিপিং স্যুটে দৌড়ে আসলেন। শাফায়াতকে জিজ্ঞেস করলেন, “শাফায়াত কী হয়েছে?” শাফায়াত বললেন, “অ্যাপারেন্টলি দুই ব্যাটালিয়ন স্টেজ অ্যা ক্যু। বাইরে কী হেেছ এখনো আমরা কিছু জানি না। রেডিওতে অ্যানাউন্সমেন্ট শুনতেছি, প্রেসিডেন্ট মারা গেছেন।” তখন জেনারেল জিয়া বললেন, ‘সো হোয়াট? লেট ভাইস প্রেসিডেন্ট টেকওভার। উই হ্যাভ নাথিং টু ডু উইথ পলিটিক্স।’

“খালেদা জিয়ার নৃশংসতা”

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের হত্যাকান্ডে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও তার স্ত্রী খালেদা জিয়া জড়িত ছিলÑ এমন মন্তব্য করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের তদন্তের জন্য আমি ১৯৮০ সালে লন্ডনে গিয়ে একটি কমিশন গঠন করি স্যার ম্যাকব্রাইট এবং স্যার টমাস উইলিয়ামকে দিয়ে। তারা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময়ও বাংলাদেশে এসেছিলেন তদন্ত করতে। অথচ জিয়াউর রহমার তাদের বাংলাদেশে আসার ভিসা দেয়নি। এই হত্যার তদন্তে জিয়াউর রহমান বাধা দিয়েছিল কেনো? যদি সে ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে জড়িত না-ই থাকে, তাহলে সে বাধা দিবে কেনো? জিয়া সম্পূর্ণভাবে জড়িত ছিল। আর জাতির পিতার আত্মস্বীকৃত খুনি, তাকে সংসদে বসিয়েছিল জিয়াউর রহমানের স্ত্রী (খালেদা জিয়া)। তার অর্থ কী দাড়াচ্ছে? জিয়া একাই নয়, তার স্ত্রীও এই হত্যাকা-ের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল; এতে কোনো সন্দেহ নেই।

২১ আগস্ট শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলার পরে, পার্লামেন্টে বেগম জিয়া বলেছিলেন, ‘ওনাকে মারতে যাবে কে?’ এমনকি তিনি এ ঠাট্টাও করেছিলেন, শেখ হাসিনা নিজেই ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে গিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার জীবনটি খালেদার কাছে এমনই ঠাট্টা-মস্করার বিষয় ছিল সেদিন। এই ঠাট্টা-মস্করার মূল উদ্দেশ্য ছিল, তখনও খালেদা জিয়ারা নিশ্চিত ছিলেন যে, ২১ আগস্ট ফেল করলে কি হয়, খুব দ্রুতই তারা শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে পারবেন। অন্যদিকে ২১ আগস্ট হত্যা চেষ্টায় খালেদা যে জড়িত ছিলেন তা অন্তত দু’জনের জবানবন্দী পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয়। মুফতি হান্নান তার জবানবন্দীতে বলে, তারা তারেক রহমানের সঙ্গে দু’বার মিটিং করে এবং তারেক তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করার বিষয়টি নিশ্চিত করে। অন্যদিকে ডিজিএফআইয়ের সাবেক ডিজি রুমি তার জবানবন্দীতে বলেন, তিনি খালেদা জিয়ার কাছে বিষয়টি তদন্ত করার নির্দেশ চেয়েও নির্দেশ পাননি। খালেদা জিয়ার এই তদন্তের নির্দেশ না দেয়া থেকে বিষয়টি স্পষ্ট হয়, তারেক রহমান সামগ্রিক বিষয়টি দেখভাল করছেন, এটা তিনি জানতেন। আর জানতেন বলেই তিনি তদন্ত করতে দেননি।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই জবানবন্দীগুলো এখন আসেনি। এসেছে আওয়ামী লীগ আমলে যখন প্রকৃত অর্থে মামলা শুরু হয় তার কিছু দিনের মধ্যে। এই দুটো জবানবন্দী ছাড়াও অন্যান্য জবানবন্দীতেও খালেদা জিয়া যে জড়িত ছিলেন বা তিনিই মূল মাস্টারমাইন্ড অথবা তারেক তাকে সব কিছু জানিয়ে হত্যা চেষ্টা অপারেশনটি সমন্বয় করে, এটা পরিষ্কার হয়। তাই স্বাভাবিকভাবে এখন প্রশ্ন আসে, এই স্পষ্ট এভিডেন্স পাওয়ার পরেও কেন খালেদা জিয়াকে এই মামলার আসামি করা হলো না? এখানে কি আওয়ামী লীগ বা বর্তমান সরকার খালেদা জিয়াকে কোন ছাড় দিতে চায়? বর্তমান সরকার বা আওয়ামী লীগ ছাড় দিতে চাইলেও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার তদন্তের ভেতর দিয়ে যে এভিডেন্স উঠে এসেছে তাতে খালেদা জিয়াকে ছাড় দেয়ার আর কোন সুযোগ নেই। এখন দেশের আইনের শাসনের স্বার্থে অবিলম্বে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা নিয়ে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে তদন্ত করে সাপ্লিমেন্টারি চার্জশীট দেয়ার সুযোগ আছে। আর ওই চার্জশীট অনুযায়ী নতুন মামলা চলার সুযোগ আছে- যা সকলে জানেন। বর্তমান সরকার যদি এ কাজ না করে তা হলে বুঝতে হবে, সরকার মুখে যাই বলুক না কেন, তারা খালেদার সঙ্গে কোন না কোন ভাবে আপোস করছে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার পূর্ণাঙ্গ বিচার তারা করছে না। তবে সরকার যদি সত্যি অর্থে আইনের শাসনে বিশ্বাসী হয়, দেশের মানুষ যদি ২১ আগস্ট হত্যার প্রকৃত বিচার চায়, তা হলে এই নতুন মামলা শুরু করার প্রয়োজন আছে। তা ছাড়া আমাদের যে সুশীল সমাজ ও আইনজ্ঞরা সব সময়ই দেশে আইনের শাসন চান, তাদেরও দাবি তোলা উচিত এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিচার হওয়ার। কারণ দিনের আলোতে রাজধানীতে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে একটি গণহত্যা হলো এবং তার সঙ্গে দেশের সে সময়ের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রীকে হত্যার চেষ্টা হলোÑ এ ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ উদ্ঘাটন ও বিচার দেশের আইনের শাসনের জন্য প্রয়োজন। দেশের বিভিন্ন সংগঠন, পেশাজীবী সম্প্রদায় ও সুশীল সমাজের তরফ থেকে তাই অচিরেই দাবি ওঠা উচিত, সরকার যেন খালেদার বিরুদ্ধে এ মামলা চালু করে। কারণ এই মামলা যদি সরকার চালু না করে তা হলে সেটা হবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা থেকে দেশকে পেছনের দিকে ঠেলে দেয়া।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এই মামলা চালু ছাড়াও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলায় আরও কিছু বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। যেমন র‌্যাব ও ডিজিএফআইয়ের কাছে খবর ছিল, তৎকালীন মন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাইজুদ্দিন একজন মাস্টারমাইন্ড ও অপারেশনে ছিল। এই তাইজুদ্দিনকে কার বাড়িতে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল? সেখান থেকে কীভাবে তাকে দেশের বাইরে পাঠানো হয়? এই সহযোগীদের অবশ্যই খুঁজে বের করা দরকার। কারণ যে ঘটনায় শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছিল ওই ঘটনার কুশীলবদের আশ্রয় দেয়া কিন্তু সমপরিমাণ অপরাধ। এর পরে দেখা দরকার ঘটনার দিন- গোলাপ শাহ মাজারের ওখান থেকে হলুদ ট্যাক্সিক্যাবে যারা দ্রুত সরে পড়েছিল, ওরা ধানম-ির কোন্ কোন্ বাড়িতে গিয়েছিল? তারা কি শুধুই সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাড়িতে গিয়েছিল, না তারেক রহমানের ওই সময়ে ধানম-িতে গোপনে নেয়া কোন বাড়ি ছিল কিনা- সেটাও দেখা দরকার। এ ছাড়া অন্য কোন বাড়িতে গিয়েছিল কিনা, তাও খোঁজ নেয়া দরকার। এগুলো জনগণের সামনে উন্মোচন হওয়া দরকার। বিশেষ করে দেশে ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের কোন হত্যাকা- না ঘটে তার জন্যই এ গুলো উদ্ঘাটিত হওয়া দরকার। এ ছাড়া ওই দিন ঘটনার সময় কেন সচিবালয়ের সামনে একটি আর্মির গাড়ি ছিল? তারা কি কাজে সেখানে ছিল সেটাও জনগণের কাছে পরিষ্কার হওয়া দরকার। ওইদিন একজন সাংবাদিক হিসেবে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যেমন এগুলো প্রত্যক্ষ করেছি, তেমনি ঢাকা মেডিক্যালে পৌঁছে দেখতে পাই সেখানে আহতদের চিকিৎসা দিতে বাধা দেয়া হচ্ছে। কার নির্দেশে সেদিন আহতদের চিকিৎসা দিতে বাধা দেয়া হয়েছিল, সেটাও খুঁজে বের করা প্রয়োজন বলে মনে করি।

বাস্তবে একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা বা শেখ হাসিনা হত্যা চেষ্টার মামলা কোন মতেই একটি সাধারণ হত্যাকাণ্ড ঘটানোর উদ্দেশ্য নয়। এটা মূলত দেশের থেকে একটি বিশেষ চিন্তাধারা বাস্তবে প্রগতিশীল চিন্তাধারার রাজনীতিকে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য ঘটানো একটি ঘটনা। যেমনটি ঘটানো হয়েছিল ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট। সে ঘটনার ভেতর দিয়ে দেশের সংবিধান এমনভাবে বদলে গেছে যে, আজও আমরা সাংবিধানিকভাবে পূর্বের অবস্থানে পৌঁছাতে পারিনি। ১৯৭৫ এর পট পরিবর্তনের ধারা থেকে দেশকে স্বাধীনতার ধারায় আনার শক্তিকে সংগঠিত করে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা। তাই তাঁকে ও তাঁর সহকর্মীদের হত্যার ভেতর দিয়ে মূলত এটাই কার্যকর করতে চেয়েছিল যে, স্বাধীনতার ধারার শক্তি যেন বাংলাদেশে সংগঠিত হতে না পারে। অন্যদিকে ২০০৪ সালে যেমন শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টা হয়েছে, তেমনি ২০০৪ সালে দেশের ৬৩টি জেলায় ৫২৯ স্থানে একযোগে জঙ্গীরা বোমা হামলা চালিয়ে তাদের শক্তির পরিচয় দেয়। তাই এখান থেকে বুঝতে কোন কষ্ট হওয়ার কথা নয় যে, ২০০৪ এ যদি খালেদা ও তারেক রহমান সফল হতেন, তারা যদি শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে পারতেনÑ তা হলে এতদিনে বাংলাদেশের ইতিহাস ভিন্ন হতো

“শেখ হাসিনাকে হত্যার ষড়যন্ত্রে তারেক”

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট নৃশংস গ্রেনেড হামলার প্রধান রূপকার হলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার প্রত্যক্ষ মদদেই ওইদিন যুদ্ধে ব্যবহূত গ্রেনেড হামলা চালিয়ে শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছিল। তবে সৌভাগ্যক্রমে শেখ হাসিনা আহত অবস্থায় বেঁচে গেলেও ২৪ জনের প্রাণহানি ঘটে। তাই এ মামলার কোনো আসামিরই অনুকম্পা পাওয়ার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বি হটাতে এমন নির্মম নিষ্ঠুর ষড়যন্ত্রের দৃষ্টান্ত ইতিহাসে মেলা ভার। শুধু দেশেই নয়, ২০০৪ সালের পর থেকে সারাবিশ্ব জুড়ে বর্বরতা, নৃশংসতা ও নিষ্ঠুরতার অপর নাম হয়ে দাঁড়ায় তারেক রহমান। আর তখনই যুক্তরাষ্ট্র ব্ল্যাক লিস্টেড করে তারেককে। দেশী-বিদেশী গুরুত্বপূর্ণ মহল তারেককে বয়কট করে, সেটি রহিত হয়নি আজও।

দেশবাসী বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ চার্জশিটভুক্ত ৪৯ আসামির মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাশা করে। শীর্ষ জঙ্গি মুফতি হান্নান, মাওলানা তাজউদ্দিন আহমেদ, আবদুস সালাম পিন্টুসহ আসামিরা তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের কাছে শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে গিয়েছিল। তখন বাবর উল্লেখিত আসামিদের হাওয়া ভবনে তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের ব্যবস্থা করে দেয়। সেদিন যদি তারেক রহমান আসামিদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সোপর্দ করতেন, তাহলে ইতিহাসের এই নৃশংস হত্যাযজ্ঞ ঘটতই না।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার ওপর হামলা হয়েছিল। আসামিরা চেয়েছিল আওয়ামী লীগের শীর্ষ রাজনীতিকদের হত্যা করতে। তারেক রহমানের সঙ্গে হাওয়া ভবনে এ নিয়ে মুফতি হান্নান, মাওলানা তাজউদ্দিন, শেখ আবদুস সালাম, মুফতি আবদুল হান্নান মুন্সী, পাকিস্তানের নাগরিক প্রশিক্ষিত আবদুল মাজেদ ভাটদের বৈঠক হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এমএস কিবরিয়া ও আহসান উল্লাহ মাস্টারকে আসামিরা যেভাবে হত্যা করেছিল, সেইভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা করা হবে। তখন প্রশ্ন আসে, জঙ্গিদের এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বিএনপি বা তারেক রহমানের ‘মিউচ্যুয়াল ইন্টারেস্ট’ কি?

জবাবে আসামিরা বলেছিল, শেখ হাসিনাকে যদি হত্যা করা না যায়, তাহলে তারা এ দেশে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের স্টাইলে জঙ্গিরাজ কায়েম করতে পারবে না। আর বিএনপি বা তারেক রহমানের লাভ হলো, তারা এ দেশে আজীবন ক্ষমতায় থাকবে। এর পরই আসামিদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তারেক রহমান ও বাবর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হত্যাকাণ্ড ঘটায়।

চার্জশিটভুক্ত ৪৯ আসামিই সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার মতো অপরাধ করেছে। গ্রেনেড হামলার পর হত্যাকারীদের বাঁচাতে তৎকালীন সরকারের মদদপুষ্ট ডিজিএফআই, এনএসআই, সিআইডি ও পুলিশ নানা তৎপরতা চালিয়েছিল। জজ মিয়া নামে একজনকে দিয়ে মিথ্যা জবানবন্দি আদায় করে মামলাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে ভুয়া চার্জশিটও দিয়েছিল। এমনকি আসামিরা যাতে বিদেশে পালিয়ে যেতে পারে সে ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন তারেক-বাবর।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা ও গবেষক, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল ও চেয়ারম্যান বাংলাদেশ মিডিয়া এন্ড ম্যানেজম্যন্ট ট্রেনিং ইনিস্টিটিউট।

Views All Time
Views All Time
364
Views Today
Views Today
1

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» কাশিয়ানীতে বালু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম! সড়কে চলাচলকারীদের ভোগান্তি চরমে!

» কাশিয়ানীতে রাতের বেলা বাড়ি ও দোকানে আগুন, বলা হচ্ছে “জিনের কাণ্ড”

» এগিয়ে চলছে কালনা সেতুর নির্মাণ কাজ

» কাশিয়ানী উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে নৌকার মাঝি হতে চান তুহিন কাজী

» কাশিয়ানীতে চেয়ারম্যানের ভাইয়ের হাতে ইউপি সদস্য লাঞ্ছিত

» শুভ জন্মদিন সুমন মুন্সী

» কাশিয়ানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১

» কাশিয়ানীতে অগ্নিকান্ডে চার বসত ঘর পুড়ে ছাই

» কাশিয়ানীতে ট্রাক চাপায় নিহত ১

» তারুণ্য নির্ভর রাজনীতিক পথিকৃৎ সালাহ উদ্দীন রাজ্জাক

» কাশিয়ানী থেকে ইয়াবা ব্যবসায়ী সাংবাদিক জাহিদ গ্রেফতার

» কাশিয়ানী থেকে মাদক ব্যবসায়ী রকিব গ্রেফতার

» কাশিয়ানী থেকে মাদক ব্যবসায়ী রকিব গ্রেফতার

» কাশিয়ানী থেকে মাদক ব্যবসায়ী রকিব গ্রেফতার

» কাশিয়ানীতে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশ-২০১৮ অনুষ্ঠিত

পরিচালনা পর্ষদ

প্রধান উপদেষ্টা : মোঃ গোলাম মোস্তফা

প্রধান সম্পাদক : নিজামুল আলম মোরাদ

সম্পাদক & প্রকাশক : পরশ উজির

পরিচালনা পর্ষদ

অঞ্চলিক অফিস ও সম্পাদকীয় কার্যালয় : প্রেস ক্লাব,
কাশিয়ানী, গোপালগঞ্জ, ঢাকা, বাংলাদেশ
নিউজ রুম : kashiani09@gmail.com 01911079050

Design & Devaloped BY Creation IT BD Limited

,

তিন জিয়ার নৃশংসতা (জিয়া+খালেদা+তারেক)…..মিঞা মুজিবুর রহমান

“বঙ্গবন্ধু হত্যায় জিয়া”
১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট শুক্রবার ভোরে একদল সেনাসদস্য নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। এই নির্মম হত্যাকাণ্ড ছিল একটি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। জিয়াউর রহমানসহ স্বাধীনতাবিরোধী চক্র মুজিবকে হত্যা করে একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণ করে। স্বাধীনতাবিরোধী যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও তাদের এদেশীয় দোসররাই যে বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্র করেছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আমেরিকারনিক্সন-কিসিঞ্জার এবং পাকিস্তানের ভুট্টো চক্র বাংলাদেশের স্বাধীনতারই শুধু বিরোধিতা করেনি, স্বধীন বাংলাদেশ যাতে বিশ্ব মানচিত্রে টিকে থাকতে না পারে তারও চক্রান্ত করেছিল।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার এবং পাকিস্তানের ভুট্টো যে বঙ্গবন্ধু হত্যা ষড়যন্ত্রে জড়িত, এর প্রমাণও রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রবল প্রতাপশালী দেশের বিরোধিতা সত্তেও মাত্র ৯ মাসের যুদ্ধে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যায়। কিসিঞ্জারের সাবেক স্টাফ অ্যাসিস্ট্যান্ট রজার মরিস এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের নেতা শেখ মুজিবের প্রতি তার (কিসিঞ্জার) ঘৃণার কথা স্বীকার করেছেন।

মরিস জানান, ‘শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে কিসিঞ্জার তার ব্যক্তিগত পরাজয় বলে মনে করতেন। কিসিঞ্জারের বিদেশি শত্রুর তালিকার সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তিরা হচ্ছেন আলন্দে, থিউ ও মুজিব। এ তিনজন তার বিভিন্ন পরিকল্পনা ভণ্ডুল করে দেন। মুজিব ক্ষমতায় আসেন সবকিছু অগ্রাহ্য করে। আমেরিকা ও তার অনুগ্রহভাজন পাকিস্তানকে সত্যিকারভাবে পরাজিত করে এবং মুজিবের বিজয় ছিল আমেরিকার শাসকবর্গের পক্ষে অত্যন্ত বিব্রতকর।

বিদেশিদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যায় সবচেয়ে বেশি উল্লসিত হন পাকিস্তানের ভুট্টো। অবশ্য ভুট্টোর পরিণতি ছিল আরও মর্মান্তিক। জে. জিয়াউল হক ভুট্টোকে ১৯৭৯ সালে ফাঁসি দেয়ার আগেই ফাঁসির সেলে সীমাহীন নির্যাতন করে। বেনজীর ভুট্টো এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ফাঁসি পূর্বে তিনি তার পিতাকে দেখতে গিয়েছিলেন। নির্যাতনের ফলে ভুট্টো এমন নির্জীব হয়ে পড়ে যে তার এক গ্লাস পানি উঠিয়ে খাওয়ার ক্ষমতা ছিল না। ১৫ আগস্ট মুজিব হত্যার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই পাকিস্তান বাংলাদেশের খুনি সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। বঙ্গবন্ধু হত্যায় খুশিতে ডগমগ ভুট্টো তাৎক্ষণিকভাবে মীরজাফর মোশতাক সরকারকে ২ কোটি ডলার মূল্যের ৫০ হাজার টন চাল ও দেড় কোটি গজ কাপড় দেয়ার কথা ঘোষণা করে। কিন্তু কিসিঞ্জার-ভুট্টোরা বাংলাদেশের খুনিদের দিয়েই হত্যাকাণ্ডটি ঘটায়। বিদেশি প্রভুদের মদতে খন্দকার মোশতাক ও সেনাবাহিনীর তৎকালীন উপ-প্রধান জে. জিয়াউর রহমানের লেলিয়ে দেয়া ফারুক-রশিদ-ডালিম-নূর চক্র বঙ্গবন্ধু পরিবার এবং তার স্বজনদের নির্মমভাবে হত্যা করে।

তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যাচ্ছে এতে দেখা যায়, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানসহ সেনাবাহিনীর তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনেকের ভূমিকাই স্বচ্ছ ছিল না। জিয়া ওই হত্যা ষড়যন্ত্রে প্রত্যক্ষভাবেই নেতৃত্ব দিয়েছেন। যেজন্য মুজিব হত্যার সবচেয়ে বড় বেনিফিশিয়ারি (লাভবান) মানুষ হচ্ছেন জিয়া।
মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের ২ বছর সিনিয়রিটি দেয়া পাকিস্তান প্রত্যাগতরা কোনভাবেই মেনে নিতে পারেননি। তাছাড়া তাদের জুনিয়র সফিউল­াহ, জিয়া, খালেদদের অধীনে চাকরি করাও তারা অপমান বোধ করতেন।

জেনারেল জিয়া যে বঙ্গবন্ধু হত্যা ষড়যন্ত্রের এদেশীয় মূল হোতা, তারও শত শত প্রমাণ রয়েছে। ১৫ আগস্ট ভোর রাতে শাফায়াত জামিলের কাছে বঙ্গবন্ধু হত্যার খবর পেয়ে জিয়া ইংরেজিতে বলেন, ‘তাতে কি হয়েছে? প্রেসিডেন্ট নেই, ভাইস প্রেসিডেন্ট তো রয়েছেন।’ এই একটি উক্তিই প্রমাণ করে হত্যা-ষড়যন্ত্রে তার যোগসাজশ। ঘাতক ফারুক রশীদ ১৯৭৬ সালেই সানডে টাইমস ও বিদেশি টেলিভিশনে প্রদত্ত সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জে. জিয়ার মদত দেয়ার কথা বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার ৯ দিনের মাথায় সেনাপ্রধান সফিউল­াহকে বরখাস্ত করে খুনি চক্র জিয়াকে সেনাপ্রধান হিসেবে পদোন্নতি দেয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার সবচেয়ে লাভবান ব্যক্তি হচ্ছেন জে. জিয়া। রাষ্ট্রপতি ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা না করলে জিয়া কোনদিনই সেনাপ্রধান, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও রাষ্ট্রপতি হতে পারতেন না।
আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীদের সুপরিকল্পিত পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই বঙ্গবন্ধু হত্যার তিন মাসের মাথায় জিয়াকে রাষ্ট্রক্ষমতায় আনা হয়। জে. জিয়ার জীবিতকালে ফারুক রশীদরা বঙ্গবন্ধু হত্যায় জিয়ার জড়িত থাকার কথা বললেও তিনি কোনদিন এর প্রতিবাদ করেননি। অন্যদিকে জে. জিয়া বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার শুধু বন্ধ রাখেননি, আত্মস্বীকৃত খুনিদের রাষ্ট্রীয় উচ্চপদে চাকরি দিয়ে প্রমাণ করেছেন, তিনি খুনিদের ঘনিষ্ঠ দোসর ছিলেন। সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান হিসেবে জে. জিয়া খুনিচক্রকে সহযোগিতা ও মদত না দিলে ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে কোনভাবেই হত্যা করা সম্ভব হতো না।

ঢাকাস্থ ৪৬ ব্রিগেডের কমান্ডার কর্নেল শাফায়াত জামিল এবং ১৫ আগস্ট বিদেশে অবস্থানরত রক্ষীবাহিনী প্রধান ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামান কোনভাবেই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড মেনে নিতে পারেননি। ‘৭৫-এর ৩রা নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বাধীন ক্যু-এর দুই শক্তিশালী স্তম্ভ ছিলেন নুরুজ্জামান ও শাফায়াত।

এটা এখন স্পষ্ট, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ব্যর্থতার কারণেই মুষ্টিমেয় কয়েকজন খুনি জাতির পিতাকে হত্যা করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হয়েছিল। যদ্দুর জানা যায়, হত্যার পর ফারুক-রশীদ চক্র অসহায় অবস্থায় সিনিয়র সেনা কর্মকর্তাদের বলতে থাকে ‘আমরা একটি ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছি। আপনারা পরিস্থিতি সামলান।’ যদি ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা সেদিন চেইন অফ কমান্ড রক্ষার মাধ্যমে সংবিধান সমুন্নত রাখতেন, তাহলে মোশতাক, সায়েম, জিয়া, এরশাদ চক্র ১৫ বছর অবৈধভাবে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে পারতো না। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচারক ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল রায়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সময় তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল সফিউল্লাহ, কর্নেল শাফায়াতসহ উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের তীব্র সমালোচনা করেছেন। রায়ে বলা হয়, ‘এই ঘটনা আমাদের জাতীয় ইতিহাসে সেনাবাহিনীর জন্য একটি চিরস্থায়ী কলঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।’

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, স্বাধীনতাবিরোধী আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীদের এদেশীয় খাদেম জে. জিয়ার ক্ষমতা লিপ্সার কারণেই সেনাবাহিনী শুধু নয়, বাংলার ইতিহাসও কলঙ্কিত হয়েছে।
সপরিবারে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল সেনাবাহিনীর কিছু কর্মকর্তা। সে সময় ঢাকা সেনানিবাসে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে কর্মরত ছিলেন আমিন আহমেদ চৌধুরী, যিনি পরে মেজর জেনারেল হয়েছিলেন। আমিন আহমেদ চৌধুরীর মৃত্যু হয় ২০১৩ সালে।

২০১০ সালে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আমিন আহমেদ চৌধুরী জানিয়েছিলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোর পাঁচটার দিকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সেনা কর্মকর্তা মেজর রশিদের নেতৃত্বে একদল সেনা তার বাড়ি ঘিরে ফেলে।

আমিন আহমেদ চৌধুরী তখনো জানতেন না যে, রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। মেজর রশিদের নেতৃত্বে সেনারা আমিন আহমেদ চৌধুরী এবং তৎকালীন কর্নেল শাফায়াত জামিলকে নিয়ে যায় মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের বাড়িতে। জেনারেল জিয়া তখন সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান।

জেনালের জিয়াউর রহমানের বাড়িতে ঢোকার সময় রেডিওর মাধ্যমে আমিন আহমেদ চৌধুরী জানতে পারেন যে, রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছে।

সেই ঘটনা প্রসঙ্গে আমিন আহমেদ চৌধুরী বিবিসিকে বলেছিলেন, ‘জেনারেল জিয়া একদিকে শেভ করছেন, একদিকে শেভ করে নাই। স্লিপিং স্যুটে দৌড়ে আসলেন। শাফায়াতকে জিজ্ঞেস করলেন, “শাফায়াত কী হয়েছে?” শাফায়াত বললেন, “অ্যাপারেন্টলি দুই ব্যাটালিয়ন স্টেজ অ্যা ক্যু। বাইরে কী হেেছ এখনো আমরা কিছু জানি না। রেডিওতে অ্যানাউন্সমেন্ট শুনতেছি, প্রেসিডেন্ট মারা গেছেন।” তখন জেনারেল জিয়া বললেন, ‘সো হোয়াট? লেট ভাইস প্রেসিডেন্ট টেকওভার। উই হ্যাভ নাথিং টু ডু উইথ পলিটিক্স।’

“খালেদা জিয়ার নৃশংসতা”

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের হত্যাকান্ডে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও তার স্ত্রী খালেদা জিয়া জড়িত ছিলÑ এমন মন্তব্য করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের তদন্তের জন্য আমি ১৯৮০ সালে লন্ডনে গিয়ে একটি কমিশন গঠন করি স্যার ম্যাকব্রাইট এবং স্যার টমাস উইলিয়ামকে দিয়ে। তারা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময়ও বাংলাদেশে এসেছিলেন তদন্ত করতে। অথচ জিয়াউর রহমার তাদের বাংলাদেশে আসার ভিসা দেয়নি। এই হত্যার তদন্তে জিয়াউর রহমান বাধা দিয়েছিল কেনো? যদি সে ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে জড়িত না-ই থাকে, তাহলে সে বাধা দিবে কেনো? জিয়া সম্পূর্ণভাবে জড়িত ছিল। আর জাতির পিতার আত্মস্বীকৃত খুনি, তাকে সংসদে বসিয়েছিল জিয়াউর রহমানের স্ত্রী (খালেদা জিয়া)। তার অর্থ কী দাড়াচ্ছে? জিয়া একাই নয়, তার স্ত্রীও এই হত্যাকা-ের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল; এতে কোনো সন্দেহ নেই।

২১ আগস্ট শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলার পরে, পার্লামেন্টে বেগম জিয়া বলেছিলেন, ‘ওনাকে মারতে যাবে কে?’ এমনকি তিনি এ ঠাট্টাও করেছিলেন, শেখ হাসিনা নিজেই ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে গিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার জীবনটি খালেদার কাছে এমনই ঠাট্টা-মস্করার বিষয় ছিল সেদিন। এই ঠাট্টা-মস্করার মূল উদ্দেশ্য ছিল, তখনও খালেদা জিয়ারা নিশ্চিত ছিলেন যে, ২১ আগস্ট ফেল করলে কি হয়, খুব দ্রুতই তারা শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে পারবেন। অন্যদিকে ২১ আগস্ট হত্যা চেষ্টায় খালেদা যে জড়িত ছিলেন তা অন্তত দু’জনের জবানবন্দী পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয়। মুফতি হান্নান তার জবানবন্দীতে বলে, তারা তারেক রহমানের সঙ্গে দু’বার মিটিং করে এবং তারেক তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করার বিষয়টি নিশ্চিত করে। অন্যদিকে ডিজিএফআইয়ের সাবেক ডিজি রুমি তার জবানবন্দীতে বলেন, তিনি খালেদা জিয়ার কাছে বিষয়টি তদন্ত করার নির্দেশ চেয়েও নির্দেশ পাননি। খালেদা জিয়ার এই তদন্তের নির্দেশ না দেয়া থেকে বিষয়টি স্পষ্ট হয়, তারেক রহমান সামগ্রিক বিষয়টি দেখভাল করছেন, এটা তিনি জানতেন। আর জানতেন বলেই তিনি তদন্ত করতে দেননি।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই জবানবন্দীগুলো এখন আসেনি। এসেছে আওয়ামী লীগ আমলে যখন প্রকৃত অর্থে মামলা শুরু হয় তার কিছু দিনের মধ্যে। এই দুটো জবানবন্দী ছাড়াও অন্যান্য জবানবন্দীতেও খালেদা জিয়া যে জড়িত ছিলেন বা তিনিই মূল মাস্টারমাইন্ড অথবা তারেক তাকে সব কিছু জানিয়ে হত্যা চেষ্টা অপারেশনটি সমন্বয় করে, এটা পরিষ্কার হয়। তাই স্বাভাবিকভাবে এখন প্রশ্ন আসে, এই স্পষ্ট এভিডেন্স পাওয়ার পরেও কেন খালেদা জিয়াকে এই মামলার আসামি করা হলো না? এখানে কি আওয়ামী লীগ বা বর্তমান সরকার খালেদা জিয়াকে কোন ছাড় দিতে চায়? বর্তমান সরকার বা আওয়ামী লীগ ছাড় দিতে চাইলেও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার তদন্তের ভেতর দিয়ে যে এভিডেন্স উঠে এসেছে তাতে খালেদা জিয়াকে ছাড় দেয়ার আর কোন সুযোগ নেই। এখন দেশের আইনের শাসনের স্বার্থে অবিলম্বে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা নিয়ে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে তদন্ত করে সাপ্লিমেন্টারি চার্জশীট দেয়ার সুযোগ আছে। আর ওই চার্জশীট অনুযায়ী নতুন মামলা চলার সুযোগ আছে- যা সকলে জানেন। বর্তমান সরকার যদি এ কাজ না করে তা হলে বুঝতে হবে, সরকার মুখে যাই বলুক না কেন, তারা খালেদার সঙ্গে কোন না কোন ভাবে আপোস করছে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার পূর্ণাঙ্গ বিচার তারা করছে না। তবে সরকার যদি সত্যি অর্থে আইনের শাসনে বিশ্বাসী হয়, দেশের মানুষ যদি ২১ আগস্ট হত্যার প্রকৃত বিচার চায়, তা হলে এই নতুন মামলা শুরু করার প্রয়োজন আছে। তা ছাড়া আমাদের যে সুশীল সমাজ ও আইনজ্ঞরা সব সময়ই দেশে আইনের শাসন চান, তাদেরও দাবি তোলা উচিত এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিচার হওয়ার। কারণ দিনের আলোতে রাজধানীতে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে একটি গণহত্যা হলো এবং তার সঙ্গে দেশের সে সময়ের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রীকে হত্যার চেষ্টা হলোÑ এ ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ উদ্ঘাটন ও বিচার দেশের আইনের শাসনের জন্য প্রয়োজন। দেশের বিভিন্ন সংগঠন, পেশাজীবী সম্প্রদায় ও সুশীল সমাজের তরফ থেকে তাই অচিরেই দাবি ওঠা উচিত, সরকার যেন খালেদার বিরুদ্ধে এ মামলা চালু করে। কারণ এই মামলা যদি সরকার চালু না করে তা হলে সেটা হবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা থেকে দেশকে পেছনের দিকে ঠেলে দেয়া।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এই মামলা চালু ছাড়াও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলায় আরও কিছু বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। যেমন র‌্যাব ও ডিজিএফআইয়ের কাছে খবর ছিল, তৎকালীন মন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাইজুদ্দিন একজন মাস্টারমাইন্ড ও অপারেশনে ছিল। এই তাইজুদ্দিনকে কার বাড়িতে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল? সেখান থেকে কীভাবে তাকে দেশের বাইরে পাঠানো হয়? এই সহযোগীদের অবশ্যই খুঁজে বের করা দরকার। কারণ যে ঘটনায় শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছিল ওই ঘটনার কুশীলবদের আশ্রয় দেয়া কিন্তু সমপরিমাণ অপরাধ। এর পরে দেখা দরকার ঘটনার দিন- গোলাপ শাহ মাজারের ওখান থেকে হলুদ ট্যাক্সিক্যাবে যারা দ্রুত সরে পড়েছিল, ওরা ধানম-ির কোন্ কোন্ বাড়িতে গিয়েছিল? তারা কি শুধুই সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাড়িতে গিয়েছিল, না তারেক রহমানের ওই সময়ে ধানম-িতে গোপনে নেয়া কোন বাড়ি ছিল কিনা- সেটাও দেখা দরকার। এ ছাড়া অন্য কোন বাড়িতে গিয়েছিল কিনা, তাও খোঁজ নেয়া দরকার। এগুলো জনগণের সামনে উন্মোচন হওয়া দরকার। বিশেষ করে দেশে ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের কোন হত্যাকা- না ঘটে তার জন্যই এ গুলো উদ্ঘাটিত হওয়া দরকার। এ ছাড়া ওই দিন ঘটনার সময় কেন সচিবালয়ের সামনে একটি আর্মির গাড়ি ছিল? তারা কি কাজে সেখানে ছিল সেটাও জনগণের কাছে পরিষ্কার হওয়া দরকার। ওইদিন একজন সাংবাদিক হিসেবে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যেমন এগুলো প্রত্যক্ষ করেছি, তেমনি ঢাকা মেডিক্যালে পৌঁছে দেখতে পাই সেখানে আহতদের চিকিৎসা দিতে বাধা দেয়া হচ্ছে। কার নির্দেশে সেদিন আহতদের চিকিৎসা দিতে বাধা দেয়া হয়েছিল, সেটাও খুঁজে বের করা প্রয়োজন বলে মনে করি।

বাস্তবে একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা বা শেখ হাসিনা হত্যা চেষ্টার মামলা কোন মতেই একটি সাধারণ হত্যাকাণ্ড ঘটানোর উদ্দেশ্য নয়। এটা মূলত দেশের থেকে একটি বিশেষ চিন্তাধারা বাস্তবে প্রগতিশীল চিন্তাধারার রাজনীতিকে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য ঘটানো একটি ঘটনা। যেমনটি ঘটানো হয়েছিল ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট। সে ঘটনার ভেতর দিয়ে দেশের সংবিধান এমনভাবে বদলে গেছে যে, আজও আমরা সাংবিধানিকভাবে পূর্বের অবস্থানে পৌঁছাতে পারিনি। ১৯৭৫ এর পট পরিবর্তনের ধারা থেকে দেশকে স্বাধীনতার ধারায় আনার শক্তিকে সংগঠিত করে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা। তাই তাঁকে ও তাঁর সহকর্মীদের হত্যার ভেতর দিয়ে মূলত এটাই কার্যকর করতে চেয়েছিল যে, স্বাধীনতার ধারার শক্তি যেন বাংলাদেশে সংগঠিত হতে না পারে। অন্যদিকে ২০০৪ সালে যেমন শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টা হয়েছে, তেমনি ২০০৪ সালে দেশের ৬৩টি জেলায় ৫২৯ স্থানে একযোগে জঙ্গীরা বোমা হামলা চালিয়ে তাদের শক্তির পরিচয় দেয়। তাই এখান থেকে বুঝতে কোন কষ্ট হওয়ার কথা নয় যে, ২০০৪ এ যদি খালেদা ও তারেক রহমান সফল হতেন, তারা যদি শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে পারতেনÑ তা হলে এতদিনে বাংলাদেশের ইতিহাস ভিন্ন হতো

“শেখ হাসিনাকে হত্যার ষড়যন্ত্রে তারেক”

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট নৃশংস গ্রেনেড হামলার প্রধান রূপকার হলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার প্রত্যক্ষ মদদেই ওইদিন যুদ্ধে ব্যবহূত গ্রেনেড হামলা চালিয়ে শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছিল। তবে সৌভাগ্যক্রমে শেখ হাসিনা আহত অবস্থায় বেঁচে গেলেও ২৪ জনের প্রাণহানি ঘটে। তাই এ মামলার কোনো আসামিরই অনুকম্পা পাওয়ার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বি হটাতে এমন নির্মম নিষ্ঠুর ষড়যন্ত্রের দৃষ্টান্ত ইতিহাসে মেলা ভার। শুধু দেশেই নয়, ২০০৪ সালের পর থেকে সারাবিশ্ব জুড়ে বর্বরতা, নৃশংসতা ও নিষ্ঠুরতার অপর নাম হয়ে দাঁড়ায় তারেক রহমান। আর তখনই যুক্তরাষ্ট্র ব্ল্যাক লিস্টেড করে তারেককে। দেশী-বিদেশী গুরুত্বপূর্ণ মহল তারেককে বয়কট করে, সেটি রহিত হয়নি আজও।

দেশবাসী বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ চার্জশিটভুক্ত ৪৯ আসামির মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাশা করে। শীর্ষ জঙ্গি মুফতি হান্নান, মাওলানা তাজউদ্দিন আহমেদ, আবদুস সালাম পিন্টুসহ আসামিরা তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের কাছে শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে গিয়েছিল। তখন বাবর উল্লেখিত আসামিদের হাওয়া ভবনে তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের ব্যবস্থা করে দেয়। সেদিন যদি তারেক রহমান আসামিদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সোপর্দ করতেন, তাহলে ইতিহাসের এই নৃশংস হত্যাযজ্ঞ ঘটতই না।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার ওপর হামলা হয়েছিল। আসামিরা চেয়েছিল আওয়ামী লীগের শীর্ষ রাজনীতিকদের হত্যা করতে। তারেক রহমানের সঙ্গে হাওয়া ভবনে এ নিয়ে মুফতি হান্নান, মাওলানা তাজউদ্দিন, শেখ আবদুস সালাম, মুফতি আবদুল হান্নান মুন্সী, পাকিস্তানের নাগরিক প্রশিক্ষিত আবদুল মাজেদ ভাটদের বৈঠক হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এমএস কিবরিয়া ও আহসান উল্লাহ মাস্টারকে আসামিরা যেভাবে হত্যা করেছিল, সেইভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা করা হবে। তখন প্রশ্ন আসে, জঙ্গিদের এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বিএনপি বা তারেক রহমানের ‘মিউচ্যুয়াল ইন্টারেস্ট’ কি?

জবাবে আসামিরা বলেছিল, শেখ হাসিনাকে যদি হত্যা করা না যায়, তাহলে তারা এ দেশে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের স্টাইলে জঙ্গিরাজ কায়েম করতে পারবে না। আর বিএনপি বা তারেক রহমানের লাভ হলো, তারা এ দেশে আজীবন ক্ষমতায় থাকবে। এর পরই আসামিদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তারেক রহমান ও বাবর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হত্যাকাণ্ড ঘটায়।

চার্জশিটভুক্ত ৪৯ আসামিই সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার মতো অপরাধ করেছে। গ্রেনেড হামলার পর হত্যাকারীদের বাঁচাতে তৎকালীন সরকারের মদদপুষ্ট ডিজিএফআই, এনএসআই, সিআইডি ও পুলিশ নানা তৎপরতা চালিয়েছিল। জজ মিয়া নামে একজনকে দিয়ে মিথ্যা জবানবন্দি আদায় করে মামলাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে ভুয়া চার্জশিটও দিয়েছিল। এমনকি আসামিরা যাতে বিদেশে পালিয়ে যেতে পারে সে ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন তারেক-বাবর।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা ও গবেষক, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল ও চেয়ারম্যান বাংলাদেশ মিডিয়া এন্ড ম্যানেজম্যন্ট ট্রেনিং ইনিস্টিটিউট।

Views All Time
Views All Time
364
Views Today
Views Today
1

সর্বশেষ আপডেট



এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



পরিচালনা পর্ষদ

প্রধান উপদেষ্টা : মোঃ গোলাম মোস্তফা

প্রধান সম্পাদক : নিজামুল আলম মোরাদ

সম্পাদক & প্রকাশক : পরশ উজির

পরিচালনা পর্ষদ

অঞ্চলিক অফিস ও সম্পাদকীয় কার্যালয় : প্রেস ক্লাব,
কাশিয়ানী, গোপালগঞ্জ, ঢাকা, বাংলাদেশ
নিউজ রুম : kashiani09@gmail.com 01911079050

Design & Devaloped BY Creation IT BD Limited